গত মে মাসে ‘রেজল্যুশন ৬৮’ নামে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ভিয়েতনাম। লক্ষ্য হচ্ছে দেশটির বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা। ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় এ অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় ২০৪৫ সালের মধ্যে দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তিন গুণ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসা টিকে আছে, তাদের কাছে এটি চাপের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
ভিয়েতনামে প্রায় ৫০ লাখ ‘হাউজহোল্ড’ বা পারিবারিকভাবে পরিচালিত ক্ষুদ্র ব্যবসা রয়েছে, যেগুলোর বড় অংশই সরকারিভাবে নিবন্ধিত নয়। ফলে সেগুলো করের আওতার বাইরে। সরকার চায় এসব ব্যবসাকে নিবন্ধিত করার মাধ্যমে মূলধারায় নিয়ে আসতে। রেজল্যুশন ৬৮ অনুযায়ী, নতুন ব্যবসার জন্য প্রথম তিন বছর কর মওকুফ থাকবে, নিবন্ধন ফি থাকবে না, প্রশাসনিক কাজ সহজ ও ডিজিটাল করা হবে এবং ভূমি, পুঁজি ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সহজতর করা হবে। ২০৪৫ সালের মধ্যে ৩০ লাখ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, যাদের সম্মিলিতভাবে জিডিপিতে ৬০ শতাংশের বেশি অবদান থাকবে।
তবে বাস্তবে অনেক ছোট ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। হো চি মিন সিটির এক সুসি দোকানি নিঘিয়েম বলেন, ‘তিনি নিজে ব্যবসাটি সরকারিভাবে নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু নতুন নিয়মে এখন তাকে মাসিক আয়ের ভিত্তিতে কর দিতে হচ্ছে, যেখানে আগে নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধ করতে হতো। এ পরিবর্তন ছোট হাউজহোল্ড ব্যবসার জন্য অনেক বেশি চাপ সৃষ্টি করছে।’
তাছাড়া অনেক রাস্তার হকার এখনো তাদের ব্যবসার নিবন্ধন সম্পন্ন করেননি। তারা মনে করেন, নিবন্ধন করলে কর দিতে হবে। তা তাদের স্বল্প আয়ে বড় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এক খুচরা দোকানি বলেন, ‘আমাদের আয় খুব কম। তাই ব্যবসা নিবন্ধনের প্রয়োজন মনে করি না।’
রেজল্যুশন ৬৮ বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে কর ফাঁকি ও নকল পণ্যে ধরপাকড়ের আশঙ্কাও বেড়েছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে, ভুয়া পণ্য বিক্রির অভিযোগে অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকার এখন থেকে এসব খাতের ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংস্কার কর্মসূচির সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। যেমন ভিনগ্রুপ, হোয়া ফাত গ্রুপ, সান গ্রুপ ও গাড়ি নির্মাতা থাকো। এসব প্রতিষ্ঠান মূলধনে শক্তিশালী, তাদের বিদেশী অংশীদার রয়েছে এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণেই তারা এগিয়ে থাকবে। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, এটি অনেকটা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘চেবল’ মডেলের মতো, যেখানে বড় করপোরেট গ্রুপগুলো বাজারে প্রভাব বিস্তার করে।
রেজল্যুশন ৬৮ এমন এক সময়ে নেয়া হয়েছে, যখন চীনের বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে ভিয়েতনাম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিয়েতনামি পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিল। তবে সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতার মাধ্যমে তা কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ভিয়েতনামের রফতানিনির্ভর জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনো গড় আয় ও ভোক্তা ব্যয় কভিড-১৯ পূর্ব অবস্থায় ফেরেনি। ফলে তাদের প্রশ্ন, ক্ষুদ্র ব্যবসা যখন চাপে রয়েছে, তখন বেসরকারি খাতনির্ভর এ প্রবৃদ্ধি কতটা স্থায়ী হবে।